‘আমি তো আর হাউস ছেড়ে পালাতে পারি না…’ ‘সমাজ মাধ্যমে নোংরামি করা হচ্ছে!’ ট’ক্সিসিটি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ নিয়ে বিস্ফোরক অভিনেতা সুদীপ মুখার্জি!

টলিউড (Tollywood) অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Banerjee) অকাল মৃত্যু বাংলা বিনোদন জগতে যে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে, তা যেন নেভার নামই নিচ্ছে না। সম্প্রতি অভিনেতা সুদীপ মুখোপাধ্যায়ের (Sudip Mukherjee) একটি সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে টলিউডের অভ্যন্তরীণ ফাটল এবং কর্মক্ষেত্রের চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনা পুনরায় জনসমক্ষে চলে এসেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে আর্টিস্ট ফোরাম এবং ফেডারেশনের নজিরবিহীন কর্মবিরতি আজ স্টুডিও পাড়ার অন্দরে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে কেন একজন অভিনেতার জীবনের বিনিময়ে বিচার চাইতে হবে? রাহুলের মৃত্যুর পর সংশ্লিষ্ট প্রোডাকশন হাউসের বিরুদ্ধে ওঠা আইনি পদক্ষেপ এবং বিচার না পাওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাহুল যে প্রোডাকশন হাউসে কাজ করতেন, তাদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ তুলে সুদীপ মুখোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ইমোশন বা আবেগের বশবর্তী হয়ে নয় বরং লিগ্যাল প্রসেস মেনেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই যুদ্ধের মাঝে পড়ে ‘চিরসখা’র মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। অফিসিয়ালি কোনো ঘোষণা না এলেও শুটিং বন্ধ থাকায় দর্শকমহলে বাড়ছে ক্ষোভ। সুদীপ বাবুর কথায়, এই পরিস্থিতি কেবল একটি সিরিয়াল বন্ধের বিষয় নয়, বরং এটি একজন শিল্পী এবং টেকনিশিয়ানের ন্যূনতম আত্মসম্মান বা ‘ডিগনিটি’ পাওয়ার লড়াই। শুটিং ফ্লোরে সামান্য ব্যান্ডেজ বা ওষুধের অভাবের যে ভয়ংকর চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন, তা টলিউডের গ্ল্যামারের আড়ালে থাকা কদর্য বাস্তবকে উন্মোচিত করে দিয়েছে।
ইন্ডাস্ট্রির এই সংকটকালে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্নবর্গের কলাকুশলীরা। লাইটম্যান থেকে শুরু করে ফ্লোরে চা সরবরাহকারী ছেলেটি যাদের কোনো সঞ্চয় নেই, তারা আজ চরম অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। সুদীপ মুখোপাধ্যায় নিজে আর্টিস্ট ফোরামের কার্যকরী সদস্য হিসেবে এই টেকনিশিয়ানদের তালিকা তৈরি করে তাদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিলেও সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, এতদিন কেন এই অব্যবস্থা নিয়ে কেউ সরব হননি? সিনিয়র অভিনেতারা এখন ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দাবি করলেও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই অবহেলা কি কেবল একটি প্রতিবাদের মাধ্যমে মিটে যাবে? নাকি এই ক্ষণস্থায়ী ঐক্য আবার কোনো নতুন প্রোজেক্টের চাপে ধামাচাপা পড়ে যাবে, তা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।
আর্টিস্ট ফোরামের নিরপেক্ষতা নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তীব্র কাদা ছোঁড়াছুড়ি। জনৈক মহলের দাবি, ফোরাম নির্দিষ্ট কিছু প্রোডাকশন হাউসের স্বার্থ রক্ষা করে। সুদীপ মুখোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে ‘অমুক হাউসের লোক’ বলে তকমা দেওয়া হচ্ছে। এই টক্সিসিটি বা বিষাক্ত পরিবেশ নিয়ে অভিনেতা বলেন যে, ২৬ বছর ইন্ডাস্ট্রিতে কাটিয়েও তাকে আজ এমন নোংরা আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে। বুম্বাদা (প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়) থেকে শুরু করে যীশু সেনগুপ্ত বা দেবদূত ঘোষেরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেও নেটিজেনদের একাংশ মনে করছেন, এই আন্দোলন কেবল কয়েকজনের ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পক্ষপাতের এই অভিযোগে টলিউড এখন দ্বিধাবিভক্ত।
আরও পড়ুনঃ খলনায়ক রক্তিমের চূড়ান্ত পরাজয়! আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে সসম্মানে মুক্তি পেল গোরা! দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব!
রাহুলের প্রয়াণ কেবল একটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং টালিগঞ্জ পাড়ার শতাব্দীপ্রাচীন ঘুণে ধরা সিস্টেমকে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। সুদীপ মুখোপাধ্যায় বর্তমানে সিরিয়াল থেকে দূরে থেকে নিজের নাটক ও বিজ্ঞাপন নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও, তার কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছে ইন্ডাস্ট্রির এক হওয়ার আকুতি। ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে প্রডিউসার থেকে শুরু করে টেকনিশিয়ান—সকলে যদি একটি পরিবারের মতো একে অপরের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেন, তবে আগামীতে আরও কত ‘রাহুল’কে আমাদের হারাতে হবে, সেই আশঙ্কাই এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। টালিগঞ্জ কি পারবে এই অন্ধকার কাটিয়ে একটি সুরক্ষিত এবং স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ উপহার দিতে, নাকি বিচার কেবল ফাইলবন্দি হয়েই থেকে যাবে?

