পর্দায় রতন, বাস্তবে শংকরের ভ্রাতৃবধূ! মানিক কাকুর সেই ছোট্ট ‘রতন’ আজ কোথায়? চন্দনা মুখার্জির স্মৃতিতে আজও অম্লান ‘পোস্টমাস্টার’!

বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) ‘তিন কন্যা’ চলচ্চিত্রের ‘পোস্টমাস্টার’ অংশটি আজও দর্শক হৃদয়ে বিষাদ জাগায়। সেই ছবির ছোট্ট ‘রতন’ চরিত্রটি ছিল গল্পের প্রাণভোমরা। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে সেই চরিত্রের রূপদানকারী অভিনেত্রী চন্দনা মুখার্জি তার জীবনের অমূল্য স্মৃতিগুলো ভাগ করে নিয়েছেন। দীর্ঘ কয়েক দশক পর পর্দার সেই ছোট্ট মেয়েটিকে দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন চলচ্চিত্র প্রেমীরা। রতন থেকে চন্দনা মুখার্জি হয়ে ওঠার এই যাত্রাটি ছিল যেমন সহজ, তেমনই গৌরবোজ্জ্বল।

চন্দনা মুখার্জির চলচ্চিত্রে আসার গল্পটি অনেকটা সিনেমার মতোই। তিনি তখন একটি নাচের স্কুলে তালিম নিতেন। একদিন হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হন খোদ সত্যজিৎ রায়। তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে নিবিষ্ট মনে চন্দনার নাচ দেখছিলেন। মূলত সেই মুহূর্তেই সত্যজিৎ রায় তার ছবির ‘রতন’কে খুঁজে পেয়েছিলেন। কোনো প্রথাগত অডিশন নয়, বরং সেই ছোট্ট মেয়েটির সহজাত শান্ত স্বভাব আর বড় বড় চোখ দেখেই রায়বাবু তাকে নির্বাচন করেন। এরপর টেকনিশিয়ান স্টুডিও এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন জায়গায় চলেছিল সেই কালজয়ী ছবির শ্যুটিং।

শ্যুটিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে চন্দনা দেবী জানান, সত্যজিৎ রায় শিশুদের মনস্তত্ত্ব খুব ভালো বুঝতেন। শ্যুটিংয়ের মাঝে তাকে যেন একঘেয়েমি না গ্রাস করে, তাই মানিক কাকু (সত্যজিৎ রায়) তার সঙ্গে বড়দের মতো গুরুত্ব দিয়ে গল্প করতেন। এমনকি তারা একসাথে বসে দুপুরের খাবার খেতেন। মানিক কাকুর নির্দেশনায় ৯ বছরের এক বালিকা যেভাবে মাতৃত্ব এবং বিচ্ছেদের গভীর ইমোশন পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা আজও বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা অভিনয় হিসেবে বিবেচিত হয়। মজার বিষয় হলো, শ্যুটিং চললেও চন্দনা দেবীর পড়াশোনার যাতে ক্ষতি না হয়, সেদিকে কড়া নজর ছিল পরিচালকের।

বিস্ময়কর বিষয় হলো, চন্দনা মুখার্জির জীবনের সাথে সত্যজিৎ রায়ের সংযোগ ছিল আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো। তার বিয়ের সময় সত্যজিৎ রায় সশরীরে উপস্থিত ছিলেন এবং পাশে বসে পুরো অনুষ্ঠান উপভোগ করেছিলেন। এমনকি চন্দনা দেবীর শ্বশুরবাড়িও ছিল সাহিত্য ও শিল্পের পীঠস্থান। প্রখ্যাত সাহিত্যিক মনিশংকর মুখোপাধ্যায় হলেন তার ভাসুর। অর্থাৎ বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি সব জায়গাতেই সত্যজিৎ রায়ের এক অদৃশ্য উপস্থিতি তাকে ঘিরে ছিল। শংকর এবং সত্যজিৎ রায়ের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও পেশাদার সম্পর্কের সাক্ষীও ছিলেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ ‘আমি একমাস রেগে ছিলাম…’ কেনো মায়ের উপর রেগে ছিল ছোট্ট সহজ? ‘আমি জানি সহজ আমাকে খুব ভালোবাসে, শুধু মাঝে মধ্যে…’ রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতিতে কিভাবে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে রয়েছে সহজ-প্রিয়াঙ্কা!

অভিনয় দিয়ে বিশ্বজয় করলেও চন্দনা মুখার্জি কিন্তু রুপোলি পর্দার হাতছানিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি। তিনি বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতার মতো মহান পেশা। কলকাতার ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাই স্কুলে দীর্ঘকাল অংকের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। পর্দার সেই আবেগপ্রবণ রতন বাস্তবে হয়ে উঠেছিলেন এক অত্যন্ত কড়া এবং আদর্শ শিক্ষিকা। বর্তমানে তিনি অবসর জীবন যাপন করছেন। সিনেমা দেখা, গান শোনা আর ছাত্রছাত্রীদের সান্নিধ্যে আজও তিনি সেই আগের মতোই পজিটিভ এবং প্রাণবন্ত। তার এই জীবনকাহিনী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পর্দার চরিত্র চিরস্থায়ী হলেও বাস্তবের মানুষটি তার কর্ম দিয়ে আরও বড় ছাপ রেখে যান।

Back to top button