‘তুই অভিনয় না করলে আমি ছবিটাই করব না!’ সত্যজিৎ রায়ের সেই আবদারমাখা নির্দেশ! ‘ওটাই আমার কাছে অস্কার…’ মমতা শঙ্করকে ছাড়া কেন অসম্পূর্ণ ছিল তাঁর চলচ্চিত্র?

কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) কাজের ধরণ এবং অভিনয়শিল্পীদের প্রতি তাঁর অগাধ আস্থা আজও চলচ্চিত্র দুনিয়ায় বিস্ময় হয়ে রয়েছে। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে প্রবীণ অভিনেত্রী মমতা শঙ্কর (Mamata Shankar) তাঁর কর্মজীবনের এমনই এক অমূল্য অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিয়েছেন। তিনি জানান, সত্যজিৎ রায় বা তাঁর ‘মানিক কাকু’র একটি বিশেষ জেদ কীভাবে তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল। শিল্পীর প্রতি পরিচালকের এই পরম নির্ভরতা প্রমাণ করে যে, সত্যজিৎ রায় কেবল বড় মাপের পরিচালকই ছিলেন না, বরং জহুরির মতো মানুষ চিনতেও ভুল করতেন না।
ঘটনাটি ছিল সত্যজিৎ রায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবির কাস্টিং নিয়ে। মমতা শঙ্কর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন যে, ছবিটির গল্প আবর্তিত হয়েছিল মূলত একটি মামা ও ভাগ্নের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। মানিক কাকু তাঁকে ডেকে অত্যন্ত সরাসরি জানিয়েছিলেন যে, নির্দিষ্ট কয়েকটি চরিত্রের জন্য তিনি আগেই অভিনেতা নির্বাচন করে ফেলেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি উৎপল দত্ত, দীপঙ্কর দে এবং স্বয়ং মমতা শঙ্করকেই ভেবে রেখেছেন। প্রিয় মানিক কাকুর মুখে নিজের নামের এমন প্রস্তাব শুনে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন অভিনেত্রী।
তবে সেই আলাপচারিতার সবথেকে চমকপ্রদ অংশটি ছিল সত্যজিৎ রায়ের অটল সিদ্ধান্ত। মমতা শঙ্কর যখন প্রস্তাবটি শোনেন, তখন পরিচালক তাঁকে একটি শর্তের মতো করে বলেছিলেন যে, যদি মমতা এই ছবিতে অভিনয় করতে রাজি না হন, তবে তিনি ছবিটিই তৈরি করবেন না। একজন বিশ্ববন্দিত পরিচালকের মুখ থেকে নিজের অভিনয় সত্তা সম্পর্কে এমন অবিচল আস্থা শোনা যেকোনো শিল্পীর কাছে পরম প্রাপ্তি। পরিচালকের সেই জেদ মমতা শঙ্করকে এতটাই আবেগপ্রবণ করে তুলেছিল যে তিনি সেই মুহূর্তেই নিজের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছিলেন, তাঁর যেন জীবনের সেরা পুরস্কার বা ‘অস্কার’ পাওয়া হয়ে গেছে।
মমতা শঙ্করের কাছে এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি পেশাদার প্রাপ্তি ছিল না, বরং এটি ছিল এক গভীর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষা। তিনি ভিডিওটিতে উল্লেখ করেন যে, সত্যজিৎ রায়ের মতো মানুষের এই অকুন্ঠ ভালোবাসা ও আশীর্বাদ তাঁকে প্রতিনিয়ত শক্ত থাকতে সাহায্য করে। জীবনের কঠিন সময়েও এই কথাগুলো তাঁকে মনে করিয়ে দেয় যে, তিনি যেন কখনও কোনো অন্যায়ের পথে পা না বাড়ান। এই আশীর্বাদের হাত যাতে কখনও মাথার ওপর থেকে সরে না যায়, সেই প্রার্থনা আজও তিনি করে চলেন। মানুষের ভুল হতে পারে, কিন্তু সজ্ঞানে অন্যায় না করার যে শিক্ষা তিনি মানিক কাকুর সান্নিধ্যে পেয়েছেন, তাই তাঁর জীবনের মূল ভিত্তি।
আরও পড়ুনঃ ‘মানুষটার প্রতি আমি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলছি…মৃ’ত ছেলেটাকে এত অশ্রদ্ধা? এত অপমান?’ রাহুলের মৃ’ত্যু নিয়ে সৌরভের মন্তব্যে তীব্র বিতর্ক! মুখ খুললেন অভিনেত্রী মৈত্রেয়ী মিত্র!
সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা কেবল সেলুলয়েডের ফিতায় আটকে নেই, বরং তাঁর সাথে কাজ করা প্রতিটি মানুষের মনে এক একটি মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মমতা শঙ্করের এই স্মৃতিচারণ আরও একবার মনে করিয়ে দিল যে, প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বড় মনের প্রয়োজন হয়। আজকের ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে যখন সম্পর্কের সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, তখন মানিক কাকু ও মমতা শঙ্করের এই শিক্ষক-ছাত্রী বা পরিচালক-শিল্পীর রসায়ন টলিউডের ইতিহাসের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় হয়েই থাকবে। এই অমূল্য স্মৃতিগুলোই বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য কাজের অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করবে।

