অভিনয়কে ভালোবেসে মৃ’ত্যুর কোলে ঝাঁপ! মাঝগঙ্গায় আ’ত্মহত্যা অভিনেত্রীর! বারবার কেন শুটিং সেট থেকে ফেরে শিল্পীদের নিথর দেহ?

বিনোদন জগতের ঝলমলে আলোর নিচে যে অন্ধকার লুকিয়ে থাকে, তা আরও একবার প্রকাশ্যে এল অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Banerjee) মর্মান্তিক প্রয়াণে। ওড়িশার তালসারিতে শুটিং করার সময় সমুদ্রে ডুবে তাঁর এই অকাল মৃত্যু কেবল টলিপাড়াকে শোকস্তব্ধ করেনি, বরং বড়সড় এক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে। এই ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগের এক ভয়াবহ স্মৃতিকে আবারও উস্কে দিয়েছে। ১৯৭৭ সালে ঠিক একইভাবে শুটিং চলাকালীন জলে ডুবে প্রাণ হারিয়েছিলেন বাংলা থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তী। পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে ঘটা এই দুটি মৃত্যুই যেন বিনোদন জগতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাটা আবারও সামনে নিয়ে এল।
সাতের দশকে বাংলা থিয়েটারের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন কেয়া চক্রবর্তী। ১৯৭৭ সালের ১২ই মার্চ ‘জীবন যেরকম’ সিনেমার শুটিং চলাকালীন হুগলি নদীতে নৌকা থেকে ঝাঁপ দেওয়ার একটি দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়ে তিনি তলিয়ে যান। পরদিন তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যেখানে শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। সেই সময় অভিযোগ উঠেছিল যে, অভিনেত্রীর নিরাপত্তার জন্য কোনো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়নি, এমনকি কোনো ‘ডামি’ বা পেশাদার ডুবুরিও ছিল না সেটে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতেও ঠিক একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে কেন তাঁর মতো একজন অভিজ্ঞ অভিনেতাকে যথাযথ সুরক্ষা ছাড়াই সমুদ্রে নামানো হয়েছিল? কেনই বা দুর্যোগপূর্ণ আবহে বা বিপজ্জনক স্থানে শুটিংয়ের জন্য আগাম সতর্কতা নেওয়া হয়নি?
রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর থেকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। জানা গেছে, তালসারির সমুদ্রতটে ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের একটি দৃশ্যের শুটিংয়ের সময় তিনি সহ-অভিনেত্রীর সঙ্গে জলে নেমেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই পা পিছলে গভীর খাদে পড়ে যান তিনি। ময়না তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে তাঁর ফুসফুসে বালি ও নোনা জল পাওয়া গেছে, যা নির্দেশ করে যে তিনি দীর্ঘ সময় জলের নিচে লড়াই করেছিলেন। অথচ ইউনিটের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করা হয়েছিল। এই পরস্পরবিরোধী বয়ান এবং শুটিংয়ের জন্য প্রশাসনের যথাযথ অনুমতি ছিল কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। টলিউডের শিল্পী ও কলাকুশলী সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় প্রযোজনা সংস্থার চরম গাফিলতি এবং ‘ক্রিমিনাল নেগ্লিজেন্স’-এর অভিযোগ তুলে বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
কেয়া চক্রবর্তী এবং রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায় উভয় ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে, তাঁরা অভিনয়ের প্রতি এতটাই একনিষ্ঠ ছিলেন যে নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। কেয়া চক্রবর্তী যেমন ‘নান্দিকার’-এর হয়ে তাঁর অসামান্য অভিনয়ের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, রাহুলও তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ারে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ থেকে শুরু করে একাধিক সিনেমা ও ধারাবাহিকে নিজের প্রতিভার ছাপ রেখে গেছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, একজন শিল্পীর এই নিষ্ঠার সুযোগ নিয়ে কি তাঁদের বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে? স্টুডিওর চার দেওয়ালের বাইরে যখন আউটডোর শুটিং হয়, তখন তাঁদের প্রাণের সুরক্ষার দায়িত্ব কার? প্রযোজক বা পরিচালকদের কি শুধুই শট শেষ করার তাড়া থাকে, নাকি শিল্পীর জীবনের মূল্য তাঁদের কাছে গৌণ?
আরও পড়ুনঃ “মর’লে একসাথেই মর’ব!” সংযুক্তার অমানবিক শর্তকে বুড়ো আঙুল দেখালো রায়ান-পারুল! দাদুকে বাঁচাতে নিল কঠিন সিদ্ধান্ত! দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব
রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই চলে যাওয়া টলিউডের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে এক প্রতিভাবান অভিনেতার এমন করুণ পরিণতি ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, পেশাদারিত্ব মানে কেবল ভালো অভিনয় বা বড় বাজেট নয়, বরং সেটে উপস্থিত প্রত্যেকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কেয়া চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর কেটে গেছে ৪৯ বছর, কিন্তু টলিউডের পরিকাঠামো বা নিরাপত্তার মানসিকতা যে তিমিরে ছিল, সেখানেই রয়ে গেছে। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এই অবহেলা ও অব্যবস্থা যদি এখনই সংশোধন না করা হয়, তবে ভবিষ্যতের আরও অনেক প্রতিভাকে হয়তো এভাবেই অসময়ে হারিয়ে যেতে হবে। রাহুল ও কেয়া দুজনকেই টলিপাড়া মনে রাখবে, কিন্তু তাঁদের এই পরিণতি যেন আর কোনো শিল্পীর ক্ষেত্রে না ঘটে, সেটাই এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।

