‘আমি গান গাইছি, উনি হুড়মুড় করে স্টেজে উঠে এলেন, ভয়ে গান থামিয়ে দিয়েছিলাম, তারপর…’ তারপর কি হয়েছিল গায়িকার সাথে? সেই অভিজ্ঞতাই ভাগ করে নিলেন হৈমন্তী শুক্লা!

বাংলা সংগীত জগতের (Music Industry) অন্যতম নক্ষত্র হৈমন্তী শুক্লা (Haimanti Sukla)। সত্তর ও আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে যাঁর কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছিল আপামর বাঙালি। কেবল শাস্ত্রীয় সংগীত নয়, বরং সেমি-ক্লাসিক্যাল এবং আধুনিক বাংলা গানে তাঁর দখল অপরিসীম। আকাশবাণী থেকে শুরু করে বড় পর্দার প্লে-ব্যাক সর্বত্রই তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের সংগীত জীবনে তিনি কাজ করেছেন দেশবরেণ্য সব সুরকারদের সঙ্গে। তবে তাঁর সংগীত জীবনের অন্যতম মাইলফলক ছিল প্রবাদপ্রতিম মান্না দের সুরে গাওয়া গানগুলি, যা আজও বাঙালির ড্রয়িংরুমে সমান জনপ্রিয়।

এই বিরল সংযোগের নেপথ্যে ছিলেন কালজয়ী গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। হৈমন্তী শুক্লার স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, পুলকবাবুর দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছে ছিল যেন মান্না দে এবং হৈমন্তী দেবীর মধ্যে একটি পেশাদার পরিচয় ঘটে। অথচ সেই সময় মান্না দে হৈমন্তী শুক্লাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ প্রচেষ্টায় হাওড়ার সালকিয়া অঞ্চলে একটি মাচা বা লাইভ ফাংশনের আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানেই ঠিক হয় যে মান্না দের উপস্থিতিতে হৈমন্তী দেবী গান গাইবেন, যাতে মান্না দে তাঁর গায়কী পরখ করে দেখতে পারেন।

সেই বিশেষ সন্ধ্যায় সালকিয়ার মঞ্চে তখন গান গাইছেন হৈমন্তী শুক্লা। আসরটি ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। তিনি একে একে আধুনিক ও কিছু ঠুমরি মিলিয়ে মিশিয়ে গান পরিবেশন করছিলেন। ঠিক এমন সময় ঘটে সেই অভাবনীয় ঘটনা। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মান্না দে হঠাৎ করেই মঞ্চে উঠে আসেন। কিংবদন্তি এই গায়ককে চোখের সামনে দেখে ভয়ে এবং বিস্ময়ে মাঝপথেই গান থামিয়ে দেন হৈমন্তী। কিন্তু মান্না দে তাঁকে থামতে না দিয়ে সহাস্যে উৎসাহ জুগিয়ে বলেছিলেন, “থামলে কেন? আমি তো তোমার গান আরও ভালো করে শুনব বলেই স্টেজে এলাম।”

মান্না দের সেই আশ্বাসে হৈমন্তী শুক্লা সেদিন দ্বিগুণ উৎসাহে গান গেয়েছিলেন। সেই মঞ্চ থেকেই মান্না দে দর্শকদের উদ্দেশে ঘোষণা করেছিলেন, “হৈমন্তী খুব ভালো গাইছে, আপনারা মন দিয়ে ওর গান শুনুন।” মঞ্চের সেই প্রশংসা কেবল মুহূর্তের ছিল না, বরং তা খুলে দিয়েছিল এক নতুন দিগন্ত। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় তৎক্ষণাৎ সুযোগ বুঝে মান্না দের কাছে আবদার করেন হৈমন্তীর জন্য একটি বাংলা গান তৈরি করে দেওয়ার। মান্না দে-ও তাঁর সুন্দর গলার ভূয়সী প্রশংসা করে রাজি হয়ে যান এবং পরের দিনই তাঁকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান।

আরও পড়ুনঃ মুম্বইয়ে দিব্যাণী মন্ডল! তবে কি টলিউড ছেড়ে এবার বলিউডে পা রাখলেন পর্দার “ফুলকি” ? দিলেন দারুন সুখবর!

পরের দিন সকালে মান্না দের বাড়িতে পৌঁছানোর পর শুরু হয় এক ঐতিহাসিক সৃষ্টির মুহূর্ত। মান্না দে হৈমন্তীর কণ্ঠের জন্য একটি যোগিয়া রাগের ওপর ভিত্তি করে খেয়াল অঙ্গের বিশেষ সুর তৈরি করেন। সেই সুরটিই ছিল আমাদের চিরপরিচিত গান “নয়নে আবির ছড়ালে”। এক শিল্পীর প্রতি অন্য এক মহৎ শিল্পীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা থেকেই জন্ম নিয়েছিল এই গানটি। হৈমন্তী শুক্লা আজও সেই দিনের কথা মনে করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, কারণ সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তটিই তাঁকে মান্না দের মতো এক মহাগুরুর স্নেহধন্য হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।

Back to top button