‘আজকের মতো এত আরাম ছিল না ‘কাট’ বললেই মূর্তির মতো স্থির থাকতে হতো, নড়লেই…!’ আগেকার দিনে শুটিংয়ে ছিল অনেক কড়াকড়ি! জীবনের শুরুতে অক্লান্ত পরিশ্রম নিয়ে অকপটে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়!

আশির দশকের চলচ্চিত্র নির্মাণের নেপথ্য কাহিনী এবং সেই সময়ের কঠিন শৃঙ্খলার কথা স্মরণ করে এক দীর্ঘ স্মৃতিচারণ করলেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায় (Roopa Ganguly)। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে উপস্থিত হয়ে তিনি জানান যে, আজকের ডিজিটাল যুগের তুলনায় সেই সময়কার শুটিং প্রক্রিয়া ছিল অনেক বেশি শ্রমসাধ্য এবং ধৈর্যের পরীক্ষা। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে একটি শট নেওয়ার পর অভিনেতাদের যে অসীম ধৈর্য দেখাতে হতো, তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে রূপকথার মতো মনে হতে পারে। রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, সেই সময়ের কঠোর পরিশ্রমই হয়তো আজকের শিল্পীদের ভিত শক্ত করে দিয়েছিল।

শুটিং সেটের সেই বিশেষ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রী জানান যে, ক্যামেরা মুভমেন্ট বা শট শেষ হওয়ার পর পরিচালক ‘কাট’ বললেও তাদের নড়াচড়া করার অনুমতি ছিল না। কারিগরি কারণে পরবর্তী শটের প্রস্তুতি না হওয়া পর্যন্ত অভিনেতাদের একেবারে মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। যতক্ষণ না সিনেমটোগ্রাফার ক্যামেরা থেকে নামতেন এবং পরিচালক তাঁর কালো কাপড়ে ঢাকা মনিটরে দৃশ্যটি পরীক্ষা করতেন, ততক্ষণ পর্যন্ত চোখের পলক ফেলাও ছিল এক প্রকার নিষিদ্ধ। এই দীর্ঘ সময় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ছিল শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।

সেই যুগে দৃশ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ছিল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। অভিনেত্রী স্মৃতিচারণ করে বলেন যে, একটি শট শেষ হওয়ার সাথে সাথে সেটের অ্যাসিস্ট্যান্টরা দ্রুত ডায়েরি নিয়ে চলে আসতেন এবং অভিনেতার খুঁটিনাটি লিখে রাখতেন। হাতের তর্জনী কোন দিকে ছিল, শার্টের কলারের বোতাম ঠিক কতটা খোলা ছিল, এমনকি চুলের গোছা কোন দিকে হেলে ছিল সবই নিখুঁতভাবে নথিভুক্ত করা হতো। সেই সাথে একজন স্টিল ফটোগ্রাফার দ্রুত কিছু ছবি তুলে নিতেন যাতে পরের শটে কোনোভাবেই অমিল না ধরা পড়ে। রূপা গঙ্গোপাধ্যায় নিজে এই বিষয়ে এতটাই সচেতন ছিলেন যে, তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেই নিজের চারপাশে কী ঘটছে সবটা খেয়াল রাখতেন।

অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরার নেপথ্যের কারিগরি দিকগুলোর প্রতিও রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের ছিল অগাধ আগ্রহ। তিনি জানান যে, ছোটবেলা থেকেই সিনেমাটোগ্রাফি এবং ছবি তোলার প্রতি তাঁর এক সহজাত টান ছিল। শটের কন্টিনিউটি বা ফ্রেম বোঝার এই ক্ষমতা তাঁর মধ্যে এতটাই প্রবল ছিল যে, তিনি মনে করেন তাঁর আসলে অনেক আগেই পরিচালনার পেশায় আসা উচিত ছিল। অভিনয়ের ব্যস্ততায় সেটি হয়ে না উঠলেও ক্যামেরার কারসাজি এবং আলোর খেলা বুঝতে তিনি সবসময়ই পছন্দ করতেন। তবে বর্তমান সময়ের স্মার্টফোন ক্যামেরার চেয়ে প্রথাগত ফটোগ্রাফিতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

আরও পড়ুনঃ মেয়ের চোখের জলের বদলা নেবেন মা! বর্ষার প্রতি সব মায়া ত্যাগ করলেন কমলিনী! প্রমাণ পেলে বর্ষাকেও কি বাড়ি ছাড়া করবে বুব্লাই? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব

রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের এই বিশ্লেষণধর্মী আলোচনাটি কেবল একটি পডকাস্টের অংশ নয়, বরং এটি বাংলা চলচ্চিত্রের বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। যে যুগে কোনো মনিটর ছিল না বা সাথে সাথে শট দেখে নেওয়ার সুযোগ ছিল না, সেই সময়ে শুধুমাত্র মেধা এবং একাগ্রতার জোরে কীভাবে কালজয়ী সব কাজ হয়েছে, তা তাঁর এই বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। প্রযুক্তির অভাব থাকলেও সেই সময়ের শিল্পীদের কাজের প্রতি যে নিখুঁত নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্ব ছিল, তা বর্তমানের হাই-টেক যুগেও বিরল বলে মনে করেন এই অভিজ্ঞ অভিনেত্রী।

Back to top button