বালিকা বধূ থেকে লড়াকু মা, সন্তান হারানোর ক্ষত বুকে চেপে আজও অম্লান সেই চেনা হাসি! জানেন কোন প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা? জেনে নিন মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের অজানা অধ্যায়!

মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের (Mousumi Chatterjee) চলচ্চিত্র জগতে আসার গল্পটি রূপকথার মতো। কলকাতার এক রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেওয়া মেয়েটি অল্প বয়সেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। কিংবদন্তি অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায় তাঁকে প্রথম লক্ষ্য করেন এবং পরিচালক তরুণ মজুমদারের কাছে তাঁর নাম প্রস্তাব করেন। অভিনয় করার সুযোগ পেয়ে তার প্রথম প্রশ্ন ছিল তার বিপরীতে হিরো কে? এই প্রশ্ন শুনে উপস্থিত সকলেই হেসেছিলেন। মাত্র ১০-১১ বছর বয়সে ১৯৬৭ সালে ‘বালিকা বধূ’ সিনেমার নামভূমিকায় অভিনয় করে তিনি রাতারাতি তারকা হয়ে ওঠেন। তাঁর সেই চঞ্চল চোখ আর ভুবনভোলানো হাসি বাঙালি দর্শকদের মনের মণিকোঠায় পাকাপাকি জায়গা করে নেয়।
বলিউডে আধিপত্য ও কর্মজীবনের সাফল্য
বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে মৌসুমী যখন মুম্বাইয়ে পা রাখেন, তখন সেখানে রাজত্ব করছেন নামী সব তারকারা। ১৯৭২ সালে শক্তি সামন্তর ‘অনুরাগ’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি সিনেমা জগতে তাঁর রাজকীয় অভিষেক ঘটে। ছবিতে একজন দৃষ্টিহীন তরুণীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়। এরপর অমিতাভ বচ্চনের সাথে ‘মঞ্জিল’, রাজেশ খান্নার সাথে ‘ভোলা ভালা’ কিংবা বিনোদ মেহরার সাথে ‘রফতার’ প্রতিটি ছবিতেই তিনি নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখেছিলেন। এমনকি সেই যুগে যখন অভিনেত্রীরা বিয়ের পর ক্যারিয়ার শেষ বলে ধরে নিতেন, মৌসুমী সেই প্রথা ভেঙে মা হওয়ার পরও একের পর এক সুপারহিট সিনেমা উপহার দিয়েছিলেন।
মৌসুমীর ব্যক্তিগত জীবন ছিল চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম শক্তিশালী পরিবারের সাথে যুক্ত। প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পুত্র জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়ের সাথে খুব অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়। শ্বশুরবাড়ির পূর্ণ সমর্থনে তিনি ঘর এবং ক্যারিয়ার সমানভাবে সামলেছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বের ছত্রছায়ায় থেকে তিনি যেমন আভিজাত্য শিখেছেন, তেমনই নিজের কাজের প্রতিও ছিলেন আপসহীন। দুই কন্যা পায়েল ও মেঘাকে নিয়ে তাঁর সাজানো সংসার ছিল ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম উদাহরণ। তবে গ্ল্যামারের এই উজ্জ্বল আলোর আড়ালে যে চরম ব্যক্তিগত বিষাদ লুকিয়ে ছিল, তা বিশ্ববাসী পরে জানতে পারে।
মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি হলো তাঁর বড় মেয়ে পায়েল মুখোপাধ্যায়ের অকাল মৃত্যু। ২০১৯ সালে দীর্ঘকাল ডায়াবেটিস ও আনুষঙ্গিক জটিলতায় ভুগে পায়েল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একজন মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যু যে কতটা পাহাড়প্রমাণ কষ্টের, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। কিন্তু এই কঠিন সময়েও তিনি দমে যাননি। মেয়ের সঠিক চিকিৎসা ও যত্নের অভাব নিয়ে তিনি শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়েছিলেন। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, পর্দার বাইরে বাস্তব জীবনেও তিনি একজন নির্ভীক ও প্রতিবাদী নারী।
আরও পড়ুনঃ মেয়ের গাউন হাতে নিয়ে হাঁটছেন বাবা! ‘চিরসখা’র মিঠি-স্বতন্ত্রর অফ-স্ক্রিন রসায়ন মন জয় করে নিলো দর্শকদের!
বর্তমানে সত্তরোর্ধ্ব এই অভিনেত্রী রুপালি পর্দা থেকে কিছুটা দূরে থাকলেও মানুষের হৃদয়ে তাঁর উপস্থিতি আগের মতোই অমলিন। ২০১৫ সালে সুজিত সরকারের ‘পিকু’ ছবিতে তাঁর প্রাণবন্ত অভিনয় নতুন প্রজন্মের দর্শকদেরও মুগ্ধ করেছে। রাজনীতিতে যোগ দিয়ে জনসেবার চেষ্টাও করেছেন তিনি। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন রিয়ালিটি শো-তে যখন তিনি উপস্থিত হন, তাঁর সেই চিরচেনা হাসি আর ঠোঁটকাটা স্পষ্টবাদিতা আজও অম্লান। সন্তান হারানোর গভীর ক্ষত বুকে চেপে রেখেও যেভাবে তিনি হাসি মুখে জীবনের বাকিটা পথ অতিক্রম করছেন, তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক পরম অনুপ্রেরণা।

