‘যাকে সহজেই পাওয়া যায়, তার প্রতি ভালোবাসা কমে যায়, যেমন আমি…’ সহজলভ্যতার যুগে হারানো আবেগ নিয়ে মুখ খুললেন রূপঙ্কর বাগচী!

বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমাদের জীবন আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল এবং সুবিধাজনক। এক ক্লিকেই যেকোনো তথ্য বা বিনোদন আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসছে। কিন্তু এই সহজলভ্যতা কি আমাদের মানসিক গভীরতা কমিয়ে দিচ্ছে? সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জনপ্রিয় গায়ক রূপঙ্কর বাগচী (Rupankar Bagchi) ভালোবাসার অবক্ষয় ও আধুনিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে এমনই এক বিষ্ফোরক অথচ বাস্তবসম্মত মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, কোনো কিছু অতি সহজে হাতের নাগালে চলে এলে তার প্রতি মানুষের চিরাচরিত যে টান বা শ্রদ্ধা থাকে, তা দ্রুত ফিকে হয়ে যায়।
রূপঙ্কর বাগচী তাঁর বক্তব্যে প্রথমেই জোর দিয়েছেন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আচরণের ওপর। তিনি মনে করেন, মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হলো যে জিনিস পেতে যত বেশি পরিশ্রম বা অপেক্ষা করতে হয়, তার প্রতি আকর্ষণ ও মূল্য তত বেশি থাকে। গায়কের ভাষায়, ‘ জিনিস খুব এভেলেবেল, যে জিনিস কিনতে হয় না, সেই জিনিসের প্রতি ভালোবাসাটাও সেরকমই থাকে।’ অর্থাৎ, শ্রমহীন প্রাপ্তি জিনিসের বাহ্যিক চাকচিক্য বজায় রাখলেও তার প্রতি আমাদের আত্মিক টান তৈরি হতে বাধা দেয়। যখন কোনো বস্তু বা অনুভূতি অনায়াসলব্ধ হয়ে যায়, তখন মানুষ অবচেতনভাবেই সেটিকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শুরু করে।
সঙ্গীতের বিবর্তনকে উদাহরণ হিসেবে টেনে রূপঙ্কর বর্তমান সময়ের এক রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। এক সময় পছন্দের শিল্পীর গান শোনার জন্য মানুষকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হতো বা দোকানে গিয়ে ক্যাসেট-সিডি সংগ্রহ করতে হতো। কিন্তু এখনকার স্মার্টফোন সংস্কৃতিতে মুহূর্তের মধ্যে মাইকেল জ্যাকসন থেকে বিটোভেন, কিংবা পার্বতী বাউলের গান শোনা সম্ভব। রূপঙ্কর আক্ষেপের সুরে বলেন যে, এই তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির ফলে সঙ্গীতের প্রতি সেই চিরন্তন শ্রদ্ধা আজ সংকটের মুখে। যখনই কোনো কিছু একঘেয়ে লাগে, আমরা সাথে সাথে অন্য কিছুতে চলে যাই, যার ফলে কোনো সৃষ্টির সাথেই আমাদের গভীর সংযোগ তৈরি হয় না।
অতীতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বই পড়ার উদাহরণের মাধ্যমে এক যান্ত্রিকহীন ভালোলাগার কথা মনে করিয়ে দেন। আগে একটি নতুন বই কিনে এনে তার ঘ্রাণ নেওয়া এবং মনোযোগ দিয়ে পড়ার মধ্যে যে প্রশান্তি ছিল, তা আজকের ডিজিটাল স্ক্রিনে স্ক্রল করার মাঝে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। রূপঙ্করের মতে, এই পুরনো অনুভূতিগুলো এখন কেবলই স্মৃতিকাতরতা বা ‘নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হওয়া’ ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি স্পষ্টভাবেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, আধুনিক প্রযুক্তির এই জোয়ারে সেই পুরনো দিনের মন্থর অথচ গভীর জীবনবোধ আর কখনোই ফিরে আসবে না।
আরও পড়ুনঃ আর আসবে না টিআরপি? কেন্দ্রীয় সরকারের কড়া পদক্ষেপ! স্থগিত করা হলো টিআরপি রেটিং! বড়সড় লোকসানের মুখে টিভি ইন্ডাস্ট্রি?
রূপঙ্কর বাগচীর এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থার এক চরম সত্যকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে সবকিছুই ‘অন-ডিমান্ড’। এই অতি-আধুনিকতা আমাদের জীবনকে সহজ করলেও কেড়ে নিচ্ছে ধৈর্য্য এবং ত্যাগের মহিমা। তাঁর এই বার্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের ভালোবাসা বা শিল্পবোধ কেবল প্রাপ্তির মধ্যে নয়, বরং সেটি পাওয়ার আকুলতা এবং অপেক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। যা সহজে পাওয়া যায়, তা বর্জন করাও এখন সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে—আর এটাই হয়তো বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

