শরতের মেঘের মতো সেই অনন্য বাঙালি! যিনি শুধু হাসাতেন না, মনের অন্দরে খুলে দিতেন আলোর জানালা! শতবর্ষ পরেও বাঙালির মনে অমর সন্তোষ দত্ত!

সন্তোষ দত্তকে শতবর্ষে স্মরণ করলে মনে হয় তিনি যেন এক বিলুপ্ত প্রজাতির বাঙালি—যাঁদের দেখা মিলত রাজশেখর বসু, বিভূতিভূষণ বা বনফুলের লেখার পাতায়। আজকের নস্ট্যালজিয়াপূর্ণ বাঙালি সমাজে তাঁর মতো সদাহাস্যময়, নিরীহ অথচ তীক্ষ্ণ বোধসম্পন্ন চরিত্র খুব কমই পাওয়া যায়। মধ্যবিত্ত বাঙালির শুক্তোপ্রিয়, পত্নীসেবিত, সরল জীবনের সূক্ষ্ম রস তিনি এমন সহজতায় ধরতে পারতেন যে মনে হতো তিনি আমাদের জীবনেরই এক দৈনন্দিন মুখ। যদিও তাঁর খ্যাতি সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই, তবু তাঁর কাজের পরিধি যে অনেক বিস্তৃত—সেই কথা বার বার মনে করিয়ে দেয় তাঁর চলচ্চিত্র তালিকা।

সত্যজিৎ রায় ছাড়াও পূর্ণেন্দু পত্রী, তরুণ মজুমদার, দীনেন গুপ্ত ও পার্থপ্রতিম চৌধুরীর মতো দক্ষ পরিচালকদের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন। এক সময় এঁরাই বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমাকে নতুন সাজে সাজিয়েছিলেন। এইসব ছবিতে সন্তোষ দত্ত রূপ দিয়েছেন এমন সব চরিত্রকে, যেগুলো আজও দর্শকের কাছে জীবন্ত। তাঁর হাসি ছিল বিশুদ্ধ, নিষ্কলুষ, কাউকে ব্যঙ্গ না করে হৃদয়ের জানলাটা খুলে দেওয়া এক আলোর রেখা। তিনি ছিলেন এমন এক শরতের মেঘ, যিনি মাটির খুব কাছের থেকেও আমাদের আকাশ দেখিয়ে দিতে পারতেন।

জটায়ুর চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল সম্পূর্ণ অভিনব। সত্যজিৎ রায় বাঙালির রহস্য ও রোমাঞ্চ সাহিত্যকে হালকা ঠাট্টার ছলে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। ছাপোষা বাঙালি লেখকদের কল্পনাজগৎ—আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার অচেনা দুনিয়া—সেই সবই জটায়ুর ভিতর দিয়ে নতুন করে দেখা গিয়েছিল। সন্তোষ দত্ত সেই কৌতুক ও সরলতার মিশেলকে এমন ভাবে জীবন্ত করলেন যে দর্শক কখনও প্রশ্নই তুলল না উট ক্যাকটাস কেন বেছে খায়। তাঁর বিশ্বাসী চোখ আর সরল উচ্চারণই এই চরিত্রকে সত্যি করে তুলেছিল।

‘মণিহারা’য় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার ভূমিকায় তিনি যেমন অনবদ্য ছিলেন, তেমনই ‘পরশপাথর’, ‘হেডমাস্টার’ বা ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এ ধরা পড়েছে এক নম্র, অনুগত, অথচ গভীরভাবে বাঙালি মনন। অবাঙালি চরিত্রে তাঁকে কল্পনা করা যেত না। তাঁর বাস্তব জীবন ছিল এক ক্রিমিনাল আইনজীবীর। তবুও অভিনয়ে তিনি যেন হয়ে উঠতেন বাঙালির প্রতিদিনের প্রতিনিধি—সেই সরলতা ও শিষ্টাচারের আড়ালে লুকানো অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা নিয়ে।

আরও পড়ুনঃ অপর্ণা সেনের মেয়ে হিসেবে নয়, নিজের যোগ্যতায় উজ্জ্বল কঙ্কনা সেনশর্মা! জন্মদিনে সুমন-পরমব্রতের উষ্ণ অভিনন্দন!

শতবর্ষে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে মনে হয় তিনি আমাদের শেষ বড় কমেডি অভিনেতা—যিনি হাসির আড়ালে কখনও আহত করেননি, বরং আমাদের দেখিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের ভিতরের শূন্যতাকে। তাঁর স্মৃতি আমাদের মনে আজও নরম আলো হয়ে থাকে। তাঁর মতো একজন অভিনেতা যে সত্যিই আর আসেননি, সেটাই তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।

Back to top button