মা-বাবা, বোন, স্ত্রী সবাই ছেড়েছেন হাত! ন’রক হয়ে উঠেছিল ব্যক্তিগত জীবন! বুকে গভীর ক্ষত নিয়েই দর্শকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন রবি ঘোষ!

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের রবি ঘোষকে চেনেন না এমন মানুষ নেই। তার অভিনীত ‘বাঘা’ চরিত্রটি এখনো বাঙালির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে রয়েছে। তার মতো কৌতুক অভিনেতা হয়তো এখনো বাঙালি একজনকেও পায়নি। তাই তার মৃত্যুর এত বছর পরেও রবি ঘোষের জায়গা বাংলা চলচ্চিত্র জগতে অপরিসীম। এমন একজন বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা নিজের অভিনয়ের প্রতি এতটাই দায়বদ্ধ ছিল যে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় গুলোতেও হাসি মুখে অভিনয় করে গেছেন এবং দর্শকদের হাসতে বাধ্য করেছেন। তার জীবনে এমন অনেক অজানা গল্প রয়েছে যা হয়তো অনেকেই জানেন না। আর এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে তাকেই শ্রদ্ধা জানানোর সাথে সাথে তার জীবনের এই অজানা গল্প বলা হল।

১৯৩১ সালের ২৪ শে নভেম্বর কলকাতায় জন্ম হয় রবি ঘোষের। তার আসল নাম হল রবীন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদার। কিন্তু সিনেমা জগত থেকে বাঙালি চলচ্চিত্র প্রেমী দর্শকের কাছে তিনি রবি ঘোষ নামেই পরিচিত। ১৯৪৯ সালে তিনি সাউথ সুবর্ধন মেইন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। তারপরে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ইন্টারপাস করে গ্র্যাজুয়েশনের জন্য তিনি আশুতোষ কলেজে ভর্তি হন। এরপরে ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি বংশাল কোর্টে কাজ করেন। তবে জানা যায় বিদ্যালয়ে পড়াকালীনই তিনি নাটকের দলে অভিনয় করেন। এরপর তিনি বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন একটি নাটকের দল যার নাম ‘বন্ধু মন’। তারপর সেই দলকে নিয়ে নাটকের মহড়া করতেন আশুতোষ কলেজের ছাদে। কিন্তু তার বাবার এসব একদমই পছন্দ ছিল না সব সময় মায়ের কাছ থেকে পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিলেন রবি ঘোষ।

অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় তাকে প্রথম ‘অঙ্গার’ নাটকে অভিনয় করতে দেখেন। তারপরেই ১৯৫৯ সালে তিনি ‘আহ্বান’ ছবিতে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। তবে তপন সিনহা পরিচালিত ‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবিতে তিনি অভিনয় করে সকলের নজর কেড়েছিলেন। তারপরেই ১৯৬৮ সালে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘গুপী গাইন বাঘা বাহিনী’- এ বাঘার চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকমহলে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন রবি ঘোষ। তবে তার দীর্ঘ অভিনয় জীবনে অন্যতম জনপ্রিয় কিছু ছবি হল, ‘বাক্স রহস্য’, ‘আগন্তুক’, ‘গুপি বাঘা ফিরে এলো’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘নৌকাডুবি’, ‘চারমূর্তি’, ‘জন অরণ্য’, ‘মৌচাক’, ‘সঙ্গিনী’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘মর্জিনা আব্দুল্লাহ’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘মনিহার’, ‘মহাপুরুষ’, ‘কষ্টিপাথর’ প্রভৃতি।

তবে অভিনয়কে তিনি এতটাই ভালবাসতেন যে জীবনে বহু যন্ত্রণার সময়ও অভিনয়কে ভুলে যেতে পারেননি। নিজের বাবা,মা, স্ত্রী এবং বোনের মৃত্যুর পরেও অভিনয় করতে গিয়েছিলেন রবি ঘোষ। ১৯৬৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর উৎপল দত্ত পরিচালিত ‘অঙ্গার’ নাটকের ৫ দিন আগেই মারা গেলেন তার বাবা দ্বিজেন্দ্রনাথ বাবু। পিতৃ বিয়োগের পর সেই শোক নিয়েই কালাশৌচের মধ্যে অঙ্গার নাটকে অভিনয় করেন তিনি, তাকে দেখে কেউ বুঝতেই পারেনি যে সদ্য নিজের প্রিয় বাবাকে হারিয়েছেন। তারপরেই তিনি অভিনয় জীবনে আস্তে আস্তে সাফল্য লাভ করছিলেন এরপর একদিন হঠাৎই মৃত্যু হয় তার বোন তপতির। মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা পরেই মঞ্চে উঠে কৌতুক নাটক ‘কনে বিভ্রাটে’ অভিনয় করে দর্শকদের হাসতে বাধ্য করেছিলেন কিন্তু নিজের মধ্যে ছিল বোন বিয়োগের শোক।
তবে তার জীবনে তিনি সবচেয়ে বড় আঘাত পেয়েছিলেন তার প্রথম পক্ষে স্ত্রী অনুভা দেবীকে হারিয়ে। ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ ছবিতে অভিনয় করার সাথে সাথেই তাদের সম্পর্কের সূচনা হয়। ১৯৭২ সালে মাথায় রক্তক্ষরণের জন্য মারা যান অনুভা দেবী। স্ত্রীকে হারিয়ে অভিনেতা এতটাই ভেঙ্গে পড়েছিলেন যে দেড় বছরের মতো অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন তিনি। অনুভা দেবী মৃত্যুর ১০ বছর পর ১৯৮২ সালে বৈশাখী দেবীকে বিয়ে করেন তিনি। অত্যন্ত সময়ানুবর্তী ছিলেন রবি ঘোষ তিনি কখনোই অভিনয় করতে আসতে দেরি করতে না। কিন্তু ‘ঠগিনি’ ছবির শুটিংয়ের সময় হঠাৎই একদিন দেরি করে শুটিংয়ে এলেন পরে জিজ্ঞাসা করে জানা যায় মৃত মাকে শ্মশানে দাহ করে তারপরেই শুটিং করতে এসেছেন অভিনেতা। তার সঙ্গে জীবনে বহুবার এমন অদ্ভুত সময় গেছে নিজের প্রিয়জনদের মৃত্যু দেখে অভিনয় করে সকলকে হাসিয়েছেন তিনি । তাই তার অভিনয় দক্ষতা নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা হয়তো কারোর নেই। ১৯৯৭ সালের ৪ ঠা ফেব্রুয়ারি বাংলা চলচ্চিত্র জগত এই প্রতিভাবান অভিনেতাকে হারিয়ে ফেলে।

